স্বাস্থ্যের জন্য দিনে কখন এবং কতটুকু আমখাওয়া উচিত ?

আমকে বলা হয় ফলের রাজা। গ্রীষ্মকাল এলেই বাজার ভরে ওঠে হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, লক্ষণভোগ ও আম্রপালি জাতের সুস্বাদু আমে। মিষ্টি স্বাদ, মনোরম গন্ধ এবং পুষ্টিগুণের জন্য আম ছোট থেকে বড় সকলের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়। তবে অনেকেই মনে করেন, বেশি আম খেলে শরীরের ক্ষতি হয় বা ডায়াবেটিস বাড়ে। বাস্তবে, সঠিক সময়ে এবং পরিমিত পরিমাণে আম খেলে এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যের জন্য দিনে কখন এবং কতটুকু আম খাওয়া উচিত, সে বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।

আমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ভিটামিন এ চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বজায় রাখে। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এছাড়া আমে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে ক্ষতিকর ফ্রি-র‌্যাডিক্যালের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।

দিনের কোন সময় আম খাওয়া সবচেয়ে ভালো, তা নিয়ে পুষ্টিবিদদের বিভিন্ন মত থাকলেও অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে আম খাওয়া সবচেয়ে উপকারী। বিশেষ করে সকালের জলখাবারের কিছু সময় পরে অথবা দুপুরের খাবারের আগে বা পরে আম খাওয়া শরীরের জন্য ভালো। এই সময় শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম সক্রিয় থাকে, ফলে আমের প্রাকৃতিক শর্করা সহজে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

খালি পেটে আম খাওয়া অনেকের ক্ষেত্রে অস্বস্তির কারণ হতে পারে। আমে প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকায় খালি পেটে খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে। এছাড়া যাদের গ্যাস বা অম্বলের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খালি পেটে আম খাওয়া পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই খালি পেটে আম না খেয়ে হালকা খাবারের পরে খাওয়াই উত্তম।

অন্যদিকে, গভীর রাতে বা ঘুমানোর ঠিক আগে আম খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ রাতে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এই সময় অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় ফল খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে পারে। তাই রাতের খাবারের অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে আম খাওয়া নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত।

এখন প্রশ্ন হলো, দিনে কতটুকু আম খাওয়া উচিত? সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দিনে এক থেকে দুই কাপ পরিমাণ কাটা আম বা একটি মাঝারি আকারের আম খেতে পারেন। এর বেশি খেলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি ও শর্করা প্রবেশ করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী অর্ধেক থেকে একটি ছোট আম যথেষ্ট।

ডায়াবেটিস রোগীদের আম খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তবে ডায়াবেটিস থাকলেই যে আম খাওয়া যাবে না, তা নয়। চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে আম খাওয়া যেতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীরা সাধারণত অল্প পরিমাণ আম খেয়ে তার সঙ্গে প্রোটিন বা আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার ওঠানামা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ওজন কমাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরাও পরিমিত পরিমাণে আম খেতে পারেন। আমে থাকা ফাইবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। তবে আমের রস, মিল্কশেক বা অতিরিক্ত চিনি মিশিয়ে আম খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। সম্পূর্ণ ফল হিসেবে আম খাওয়াই সবচেয়ে উপকারী।

অনেকেই আম খাওয়ার আগে কিছু সময় জলতে ভিজিয়ে রাখার পরামর্শ দেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ মিনিট জলতে ভিজিয়ে রাখলে আমের গায়ে থাকা ধুলোবালি ও কিছু প্রাকৃতিক উপাদান দূর হয় এবং হজমেও সুবিধা হয়। যদিও এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মতভেদ রয়েছে, তবুও স্বাস্থ্যবিধির দিক থেকে ফল ধুয়ে পরিষ্কার করে খাওয়া অবশ্যই জরুরি।

আম খাওয়ার সময় আরও একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। আমের সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার বা সফট ড্রিংকস খেলে শরীরে ক্যালোরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই আমের সঙ্গে দই, বাদাম বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া বেশি উপকারী।

সর্বোপরি বলা যায়, আম একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। তবে যেকোনো ভালো জিনিসের মতোই আমও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। দিনের প্রথম ভাগে বা দুপুরের সময় পরিমাণমতো আম খেলে শরীর তার পুষ্টিগুণ ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে। অতিরিক্ত আম খাওয়া যেমন ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি অযথা ভয় পেয়ে এই পুষ্টিকর ফলকে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়াও ঠিক নয়। সঠিক সময়ে এবং সঠিক পরিমাণে আম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে এই ফল আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শরীরকে সতেজ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তাই বলা যায়, সুস্থ জীবনের জন্য প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে সঠিক সময়ে আম খাওয়াই হলো স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের অন্যতম চাবিকাঠি।

4,287 currently viewing
10,002 total views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *